অন্য খবর

ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন যেসব খাবার

ক্যানসার নিয়ে উদ্বেগ এখন অনেকের মধ্যেই রয়েছে। রোগটি প্রতিরোধে জীবনযাপনের ধরন, শরীরের ওজন, শারীরিক পরিশ্রম এবং খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিছু খাবারের সঙ্গে নির্দিষ্ট ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্কও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

চিকিৎসাবিষয়ক ওয়েবসাইট হেলথলাইনের এক প্রতিবেদনে এমন কয়েকটি খাবারের কথা বলা হয়েছে। এসব খাবারে থাকা বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান ও উদ্ভিজ্জ যৌগ নিয়ে গবেষণা হয়েছে। তবে এগুলো ক্যানসারের চিকিৎসা নয় এবং শুধু এসব খাবার খেলেই ক্যানসার প্রতিরোধ করা সম্ভব, এমন নিশ্চয়তাও নেই।

১. ব্রোকলি

ব্রোকলিসহ ক্রুসিফেরাস বা বাঁধাকপি গোত্রের সবজিতে সালফোরাফেন নামের একটি উদ্ভিজ্জ যৌগ থাকে। গবেষণাগারে এই উপাদানের ক্যানসার প্রতিরোধী সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা হয়েছে।

২০১০ সালের একটি টেস্ট-টিউব গবেষণায় দেখা যায়, সালফোরাফেন স্তন ক্যানসারের কোষের আকার ও সংখ্যা ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়েছে। ২০০৪ সালে প্রাণীর ওপর করা আরেক গবেষণায় দেখা যায়, সালফোরাফেন ব্যবহারে ইঁদুরের প্রোস্টেট ক্যানসারের কোষ ধ্বংস এবং টিউমারের আকার ৫০ শতাংশের বেশি কমেছে।

এ ছাড়া কিছু গবেষণায় ব্রোকলির মতো ক্রুসিফেরাস সবজি বেশি খাওয়ার সঙ্গে কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তাই নিয়মিত খাদ্যতালিকায় ব্রোকলি রাখা যেতে পারে।

২. গাজর

গাজর খাওয়ার সঙ্গেও কয়েক ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে বিভিন্ন গবেষণায়। ২০১৫ সালে প্রকাশিত একাধিক গবেষণার পর্যালোচনায় দেখা যায়, নিয়মিত গাজর খাওয়ার সঙ্গে পাকস্থলীর ক্যানসারের ঝুঁকি প্রায় ২৬ শতাংশ কম থাকার সম্পর্ক রয়েছে। আরেকটি পর্যালোচনায় গাজর বেশি খাওয়ার সঙ্গে প্রোস্টেট ক্যানসারের ঝুঁকি ১৮ শতাংশ কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া যায়।

১৯৮৬ সালের একটি গবেষণায় ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত ও আক্রান্ত নন, এমন ১ হাজার ২৬৬ জনের খাদ্যাভ্যাস বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকেরা দেখতে পান, ধূমপান করেন কিন্তু গাজর খান না, এমন ব্যক্তিদের ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি সপ্তাহে অন্তত একবার গাজর খাওয়া ব্যক্তিদের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি ছিল।

গাজরে থাকা বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান ত্বকের জন্যও উপকারী। তাই নিয়মিত খাদ্যতালিকায় গাজর রাখা যেতে পারে।

৩. শিম ও বিনজাতীয় খাবার

শিম ও বিভিন্ন ধরনের বিনজাতীয় খাবারে প্রচুর ফাইবার থাকে। কিছু গবেষণায় ফাইবার গ্রহণের সঙ্গে কোলোরেক্টাল বা বৃহদান্ত্র ও মলাশয়ের ক্যানসারের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

২০০৬ সালের একটি গবেষণায় কোলোরেক্টাল টিউমারের ইতিহাস থাকা ১ হাজার ৯০৫ জনকে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, যাঁরা বেশি পরিমাণে রান্না করা শুকনা বিন খেয়েছেন, তাঁদের টিউমার পুনরায় হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক কম।

২০০২ সালে ইঁদুরের ওপর করা আরেক গবেষণায় কালো বিন ও নেভি বিন খাওয়ানোর পর দেখা যায়, এসব বিনজাতীয় খাবার কোলন ক্যানসারের কোষের বিকাশ সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রতিরোধ করতে পারে।

৪. বেরিজাতীয় ফল

ব্লুবেরি, ব্ল্যাকবেরি, রাস্পবেরি ও স্ট্রবেরির মতো ফলে অ্যান্থোসায়ানিন নামের উদ্ভিজ্জ রঞ্জক থাকে। এই উপাদানের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা হয়েছে।

একটি ছোট গবেষণায় কোলোরেক্টাল ক্যানসারে আক্রান্ত ২৫ জনকে সাত দিন বিলবেরির নির্যাস দেওয়া হয়। এতে তাঁদের ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি ৭ শতাংশ কমতে দেখা যায়।

আরেক গবেষণায় মুখের ক্যানসারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের হিমায়িত ও শুকনা ব্ল্যাক রাস্পবেরির গুঁড়া দেওয়া হলে ক্যানসারের অগ্রগতির সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি সূচকের মাত্রা কমে আসে।

২০০১ সালের প্রাণীভিত্তিক এক গবেষণায় ইঁদুরকে হিমায়িত ও শুকনা ব্ল্যাক রাস্পবেরি খাওয়ানোর পর খাদ্যনালির টিউমারের হার সর্বোচ্চ ৫৪ শতাংশ কমে এবং টিউমারের সংখ্যাও সর্বোচ্চ ৬২ শতাংশ কমতে দেখা যায়।

৫. দারুচিনি

দারুচিনি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও প্রদাহ কমানোর মতো বিভিন্ন সম্ভাব্য স্বাস্থ্য উপকারের জন্য পরিচিত। পরীক্ষাগার ও প্রাণীর ওপর পরিচালিত কিছু গবেষণায় দারুচিনির ক্যানসারবিরোধী সম্ভাবনাও দেখা গেছে।

২০১০ সালের একটি গবেষণায় দারুচিনির নির্যাসের প্রভাব পরীক্ষা করে দেখা যায়, এটি ক্যানসার কোষের বিস্তার কমানোর পাশাপাশি কোষের মৃত্যুতে ভূমিকা রেখেছে।

অন্য একটি পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণায় দারুচিনির অপরিহার্য তেল মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি কমিয়েছে এবং টিউমারের আকারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে।

খাদ্যতালিকায় প্রতিদিন আধা থেকে এক চা-চামচ বা ২ থেকে ৪ গ্রাম দারুচিনি রাখা যেতে পারে। তবে দারুচিনিকে ক্যানসারের চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

৬. বাদাম

নিয়মিত বাদাম খাওয়ার সঙ্গে কিছু ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্কও বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া গেছে।

২০১৫ সালের একটি গবেষণায় ১৯ হাজার ৩৮৬ জনের খাদ্যাভ্যাস বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, যাঁরা বেশি পরিমাণে বাদাম খেয়েছেন, তাঁদের ক্যানসারে মৃত্যুর ঝুঁকি তুলনামূলক কম ছিল।

একই বছরে প্রকাশিত আরেকটি পর্যালোচনায় ৩০ হাজার ৭০৮ জনের ওপর পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণার ফল বিশ্লেষণ করা হয়। এতে নিয়মিত বাদাম খাওয়ার সঙ্গে কোলোরেক্টাল, অগ্ন্যাশয় ও জরায়ুর আবরণীর ক্যানসারের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া যায়।

৭. জলপাইয়ের তেল

জলপাইয়ের তেল বা অলিভ অয়েলে বিভিন্ন স্বাস্থ্যকর উপাদান রয়েছে। ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্যাভ্যাসের অন্যতম প্রধান উপকরণও এটি।

২০১১ সালে প্রকাশিত ১৯টি গবেষণার একটি পর্যালোচনায় দেখা যায়, যাঁরা বেশি জলপাইয়ের তেল খান, তাঁদের স্তন ও পরিপাকতন্ত্রের ক্যানসারের ঝুঁকি তুলনামূলক কম।

এ ছাড়া ২০০০ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বিশ্বের ২৮টি দেশের ক্যানসারের হার বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, যেসব অঞ্চলে জলপাইয়ের তেল খাওয়ার প্রবণতা বেশি, সেখানে কোলোরেক্টাল ক্যানসারের হারও তুলনামূলক কম।

৮. লেবুজাতীয় ফল

লেবু, বাতাবি লেবু, জাম্বুরা ও কমলার মতো লেবুজাতীয় ফলও খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় এসব ফল বেশি খাওয়ার সঙ্গে কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

২০১০ সালের একটি বড় গবেষণায় দেখা যায়, যাঁরা বেশি লেবুজাতীয় ফল খান, তাঁদের পরিপাকতন্ত্র এবং শ্বাসতন্ত্রের ওপরের অংশের ক্যানসারের ঝুঁকি তুলনামূলক কম।

২০০৯ সালে নয়টি গবেষণার ফল নিয়ে করা একটি পর্যালোচনায় লেবুজাতীয় ফল বেশি খাওয়ার সঙ্গে অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া যায়।

৯. তিসিবীজ

তিসিবীজে ফাইবার ও হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী চর্বি রয়েছে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এটি ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

২০০৫ সালের একটি গবেষণায় স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত ৩২ জন নারীকে এক মাসের বেশি সময় প্রতিদিন তিসিবীজের মাফিন অথবা প্লাসিবো দেওয়া হয়। গবেষণা শেষে তিসিবীজ খাওয়া নারীদের শরীরে টিউমারের বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি সূচকের মাত্রা কমে যায় এবং ক্যানসার কোষের মৃত্যুর হার বাড়ে।

২০০৮ সালের আরেক গবেষণায় প্রোস্টেট ক্যানসারে আক্রান্ত পুরুষদের ক্ষেত্রে তিসিবীজ ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি ও বিস্তার কমাতে পারে বলে দেখা যায়। তিসিবীজে থাকা ফাইবার কোলোরেক্টাল ক্যানসার প্রতিরোধেও সহায়ক হতে পারে।

খাদ্যতালিকায় তিসিবীজ রাখতে চাইলে প্রতিদিন প্রায় এক টেবিল-চামচ বা ১০ গ্রাম গুঁড়া তিসিবীজ স্মুদি, দই, সিরিয়াল কিংবা বেক করা খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়া যেতে পারে।

১০. টমেটো

টমেটোর উজ্জ্বল লাল রঙের জন্য দায়ী লাইকোপিন নামের প্রাকৃতিক উপাদানটির ক্যানসারবিরোধী সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা হয়েছে।

বিভিন্ন গবেষণায় টমেটো ও লাইকোপিন বেশি খাওয়ার সঙ্গে প্রোস্টেট ক্যানসারের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ২০১৩ সালে ১৭টি গবেষণার একটি পর্যালোচনায় দেখা যায়, কাঁচা ও রান্না করা টমেটো এবং লাইকোপিন বেশি খাওয়ার সঙ্গে প্রোস্টেট ক্যানসারের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক রয়েছে।

২০০২ সালের একটি গবেষণায় ৪৭ হাজার ৩৬৫ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিশেষ করে টমেটোর সস বেশি খাওয়ার সঙ্গে প্রোস্টেট ক্যানসারের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক রয়েছে।

স্যান্ডউইচ, সালাদ, সস বা পাস্তার সঙ্গে টমেটো যোগ করে প্রতিদিন এক থেকে দুই পরিবেশন খাওয়া যেতে পারে।

১১. রসুন

রসুনে থাকা অ্যালিসিন নামের সক্রিয় উপাদান নিয়েও ক্যানসারবিরোধী সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা হয়েছে। পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণায় এই উপাদান ক্যানসার কোষ ধ্বংসে ভূমিকা রাখতে পারে বলে দেখা গেছে।

২০১১ সালের একটি পর্যালোচনায় ৫ লাখ ৪৩ হাজার ২২০ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, রসুন, পেঁয়াজ, পেঁয়াজপাতা ও শ্যালটের মতো অ্যালিয়াম গোত্রের সবজি বেশি খাওয়া ব্যক্তিদের পাকস্থলীর ক্যানসারের ঝুঁকি এসব খাবার কম খাওয়া ব্যক্তিদের তুলনায় কম ছিল।

১২. চর্বিযুক্ত মাছ

সপ্তাহে কয়েকবার মাছ খাওয়ার সঙ্গেও কিছু ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ১৯৯৯ সালের একটি বড় গবেষণায় বেশি মাছ খাওয়ার সঙ্গে পরিপাকতন্ত্রের ক্যানসারের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া যায়।

২০০৫ সালে ৪ লাখ ৭৮ হাজার ৪০ জন প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা যায়, বেশি মাছ খাওয়া ব্যক্তিদের কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ঝুঁকি তুলনামূলক কম। অন্যদিকে, লাল ও প্রক্রিয়াজাত মাংস খাওয়ার সঙ্গে এ ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

স্যামন, ম্যাকারেল ও অ্যাঙ্কোভির মতো চর্বিযুক্ত মাছে ভিটামিন ডি ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে। তাই সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে নিয়মিত মাছ রাখা যেতে পারে।

সব মিলিয়ে, ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে শুধু একটি বা দুটি খাবারের ওপর নির্ভর করার সুযোগ নেই। পুষ্টিকর ও বৈচিত্র্যময় খাবার, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং ধূমপানসহ ক্ষতিকর অভ্যাস এড়িয়ে চলা গুরুত্বপূর্ণ। আর কোনো খাবার ক্যানসার প্রতিরোধ বা চিকিৎসা নিশ্চিত করে না। ক্যানসার নিয়ে উদ্বেগ বা ব্যক্তিগত ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button